
তেইশ বছর। পুরো তেইশ বছর ধরে একজন মানুষ একটা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক পদে বেতন তুলছেন, অথচ সেই প্রতিষ্ঠানে তার উপস্থিতি কেবল "বিশেষ প্রোগ্রামে" সীমিত। বাকি সব কাজ চলে বাসা থেকে। সেলিমুজ্জান সেলু নামের এই বিএনপি নেতা শুধু প্রধান শিক্ষক নয়, একই সাথে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি, তিনটা পদ একই হাতে, আর তিনটাই একে অপরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খসড়া আচরণবিধি স্পষ্ট বলছে, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন না, রাজনৈতিক পদ নিতে পারবেন না। লঙ্ঘন হলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অধীনে অসদাচরণ, শাস্তি বরখাস্ত বা অপসারণ পর্যন্ত যেতে পারে। এই নিয়ম কাগজে আছে, প্রয়োগে নেই। কারণ যাকে শাস্তি দেওয়ার কথা, তিনিই স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্র। উপজেলা শিক্ষা অফিসার নিজেই বলছেন তিনি "বিগত সরকারের আমলেও প্রধান শিক্ষক ছিলেন, এখনও আছেন", এই একটা বাক্যেই বোঝা যায় প্রশাসন বিষয়টা জানে, মানে, এবং মেনে নিয়ে বসে আছে।
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, সরকার পতনের ঠিক এক মাসের মাথায়, সেলু উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন, ছয় মাসের জন্য সভাপতি হন। জেলা শাখার কোনো অনুমোদন নেননি, এটা জেলা সভাপতি নিজেই স্বীকার করেছেন। ছয় মাস পার হয়ে গেছে এক বছর আট মাস আগে। নির্বাচন হয়নি। মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে নিজের সুবিধামতো, কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই। অর্থাৎ একটা অস্থায়ী কমিটিকে স্থায়ী ক্ষমতায় রূপ দেওয়ার এই কৌশল একদম একই কৌশল, যা আগের শাসনামলে আমরা বারবার দেখেছি, যেখানে "অ্যাডহক" শব্দটা আসলে "অনির্দিষ্টকালের জন্য" বোঝাতো।
এখানে সবচেয়ে বিরক্তিকর জায়গাটা হলো সময়ের হিসাব। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যে মানুষগুলো বলেছিল, তথাকথিত পুরোনো দলীয়করণ আর সিন্ডিকেট ভাঙা হবে, তারাই এখন একই কাঠামো ব্যবহার করছে, শুধু লেবেল বদলে। আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চোখে ধুলো দিয়ে বেতন তুলতেন সেলু, এখন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে একই কাজ করছেন। প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াও এক, "তদন্ত হবে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে"। উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেছেন এটা, জেলা শিক্ষা অফিসারও বলেছেন একই কথা, প্রায় একই শব্দে। এই বাক্যগুলো এখন একটা প্রশাসনিক রিফ্লেক্স, দায় এড়ানোর প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা, যার পেছনে কোনো সময়সীমা নেই, কোনো ফলো-আপ নেই।
প্রশ্নটা তাই প্রাসঙ্গিকভাবে এসেই পড়ে। যে দল ক্ষমতায় এসেছে "সংস্কার" আর "জবাবদিহিতা" এই দুটো শব্দকে পুঁজি করে, সেই দলেরই একজন শীর্ষ স্থানীয় নেতা যদি ২৩ বছর ধরে চলা একটা প্রকাশ্য অনিয়মের প্রধান সুবিধাভোগী হন, এবং সরকার পরিবর্তনের পর সেই সুবিধা আরও সংগঠিতভাবে কাজে লাগান, তাহলে "সংস্কার" শব্দটার মানে কী থাকে?
সূত্র: https://www.jagonews24.com/country/news/1126550